পানি খুঁজতে গিয়ে গ্যাসের আগুন: ইনানীতে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বলছে মাটির নিচের আগুন
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ বসানোর কাজ চলাকালে মাটির নিচ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আগুন ধরে গেছে, আর সেই আগুন ২৮ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বলছে। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট চেষ্টা করেও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। নিরাপত্তার কারণে আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
কীভাবে শুরু হলো আগুন
ইনানীর জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানী সেতুর কাছে মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বাড়ির উঠানে গভীর নলকূপ বসানোর কাজ চলছিল। স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ দিন আগে কাজ শুরু হয় এবং প্রায় ১,০০০ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করেও পানি মেলেনি। এরপর আগের খননস্থান থেকে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন ধরে যায়। শ্রমিকরা প্রথমে নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন।
প্রতিবেদনগুলোতে আগুন লাগার সঠিক সময় নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা আছে—কোনো প্রতিবেদনে ভোর ৬টার কথা বলা হয়েছে, আবার কোনোটিতে সাড়ে ৭টার কথা। তবে মূল ঘটনাক্রম নিয়ে সব প্রতিবেদন একমত: নলকূপের গর্ত দিয়ে গ্যাস বের হওয়ার পরই আগুন ধরে যায়। আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট উৎস এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি; প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কোনো স্ফুলিঙ্গ বা বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শ থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টা ও বিদ্যুৎ বন্ধ
খবর পেয়ে উখিয়া ও কক্সবাজার সদর থেকে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চারটি ইউনিট চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বলে জানিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। পরে সেনাবাহিনীর ফায়ার টিমও সহায়তায় যোগ দেয় বলে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
আগুনের পাশ দিয়ে যাওয়া ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইনের ঝুঁকির কারণে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আশপাশের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। স্থানীয় প্রশাসন ভিড় নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করেছে এবং কৌতূহলী মানুষকে ঘটনাস্থল থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে।
বাপেক্স দলের পর্যবেক্ষণ: কেন জোর করে নেভানো ঝুঁকিপূর্ণ
ঘটনার পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) একটি বিশেষজ্ঞ দল মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। দলের প্রধান ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিকুন আরহাম জানান, খনন প্রায় ১,০০০ ফুট গভীরে গিয়ে গ্যাসযুক্ত একটি স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে থাকতে পারে। সেখান থেকে উচ্চচাপের গ্যাস মাটির ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ওপরে উঠে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগুনের শিখা ও ধোঁয়া দেখে মনে হচ্ছে গ্যাসে ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে, তবে তা নিশ্চিত হতে গ্যাসের নমুনার ল্যাবরেটরি পরীক্ষা প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, জোর করে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করলে গ্যাস অন্য কোনো ফাটল দিয়ে বেরিয়ে নতুন বিপদ তৈরি করতে পারে। তাই ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে এলাকাটি ঘিরে রাখার এবং সেখানে জনসমাগম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বুধবার সকালে বাপেক্স দল গ্যাসের নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করে।
স্থানীয়দের আতঙ্ক ও পর্যটন এলাকায় উদ্বেগ
ইনানী কক্সবাজারের একটি পরিচিত পর্যটন এলাকা। রাতভর আগুন জ্বলতে থাকায় এবং সন্ধ্যার পর গ্যাসের নির্গমন বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের হোটেলে কর্মরতদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, মাটির নিচে আসলেই কোনো বড় গ্যাসের মজুত আছে কি না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না।
এ ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, গভীর খননের সময় ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পানির খোঁজে শুরু হওয়া একটি সাধারণ নলকূপের কাজ কীভাবে একটি বড় নিরাপত্তা-ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে, ইনানীর ঘটনা তারই উদাহরণ।
বুধবার দুপুর পর্যন্ত আগুন জ্বলছিল এবং বাপেক্সের পরীক্ষার ফলাফল ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে সবার নজর রয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (২৮ ও ২৭ অক্টোবর ২০২৬), ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (বিএসএসের বরাতে, ২৭ অক্টোবর ২০২৬), দ্য অবজারভার (২৮ অক্টোবর ২০২৬), টাইমস অব বাংলাদেশ (২৮ অক্টোবর ২০২৬)।

Leave a public comment