হামের মৃত্যু বেড়ে ১২৪২, একদিনে আরও দুই শিশুর মৃত্যু
বাংলাদেশে হাম ও হামজাতীয় উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৪২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আজ ২৮ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে এক হাজার ৩২২ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, আর পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছেন ৯০ জন।
মৃতের সংখ্যা কীভাবে গোনা হচ্ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক হালনাগাদ অনুযায়ী, মোট এক হাজার ২৪২ জনের মধ্যে এক হাজার ১৩৭ জন সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যু, আর ১০৫ জনের মৃত্যু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ বেশিরভাগ মৃত্যুই সন্দেহভাজন হিসেবে গণনা করা হচ্ছে, যেখানে উপসর্গ হামের সঙ্গে মিলেছে কিন্তু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর এই পার্থক্য বোঝা জরুরি, কারণ এতে প্রাদুর্ভাবের আসল চিত্র পরিষ্কার হয়।
আক্রান্তের সংখ্যা কত দাঁড়াল
নতুন রোগীসহ এখন পর্যন্ত দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ১০৬ জনে। পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৬৩১ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন হামে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুই লাখ ৩১৯ জন, যাদের মধ্যে এক লাখ ৯২ হাজার ১৭৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। প্রতিদিন এক হাজারের বেশি নতুন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হওয়া প্রাদুর্ভাব এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজনই শিশু। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দাগের মাধ্যমে ছড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো টিকা নেওয়া থাকলে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
টিকাদান ব্যবস্থায় ঘাটতির চিত্র
এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকেও আঙুল উঠছে। সম্প্রতি একটি স্বাধীন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে টিকাদানকারীর অনুমোদিত পদের ৪০ শতাংশই খালি রয়েছে। কোল্ড-চেইন টেকনিশিয়ানের ৫৩ শতাংশ পদ এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সদর দপ্তরের ৪৫ শতাংশ পদও শূন্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও টিকাদান সেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জনবল বাড়েনি বলে পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এই ঘাটতি স্বীকার করে নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন।
অভিভাবকদের কী করা উচিত
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুর হামের টিকা দেওয়া আছে কি না তা এখনই যাচাই করে নেওয়া উচিত। জ্বর ও শরীরে দাগ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে, আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। টিকা না নেওয়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার ওপরই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, কারণ এটাই প্রাদুর্ভাব থামানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সব মিলিয়ে, মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ২৪২-এ পৌঁছানো একটি উদ্বেগজনক সংকেত। দৈনিক নতুন রোগীর সংখ্যা এখনো উচ্চ পর্যায়ে থাকায় সতর্কতা, টিকাদান এবং দ্রুত চিকিৎসা—এই তিনটি বিষয়েই জোর দিতে হবে।
সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) দৈনিক হালনাগাদ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২৮ অক্টোবর ২০২৬; স্বাধীন টিকাদান পর্যালোচনা প্রতিবেদন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২৮ অক্টোবর ২০২৬।

Leave a public comment